Avatar

অথ মালসা কান্ড

Samir Pramanick

গুরু ঠাকুরের নির্দেশ। বেদ বাক্য। আর সেই গুরু ঠাকুরেরই কিনা এমন বেইজ্জতি! তবে খুলেই বলি। ঘটনাটা বেশ পুরোনো।ছোটোবেলায় ঠাকুর্দার মুখে শোনা। তখন গুরু ঠাকুরদের জন্যে সাধারণের মনে ভক্তি ভাবের অভাব ছিলো না,এখনকার মতো। বরং শ্রদ্ধা, ভক্তির ভাব বেশ উপচে পড়তো। বৎসরান্তে গুরুদেব শিষ্য বাড়ি দর্শন দিতে আসতেন, অন্তত একবার। একেবারে নিয়ম করে। এসে দুচার দিন কাটিয়ে গিয়ে ধন্য করতেন গৃহস্থকে। সানাইয়ের সর্বক্ষণের সঙ্গী যেমন তার পোঁ, তেমনই তাঁর সঙ্গে থাকতেন বিশ্বস্ত এক চেলা। ফাইফরমাস খাটা, শিষ্য বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ফলমুল, চাল, কলার মোট বইবার কাজ ছিল তার। পশ্চিম পাড়ার সনাতন হালদার। পেশায় চাষী। আর এ তল্লাটের সবচাইতে সম্পন্ন ব্যাক্তি। চার ছেলে। তিন মেয়ে। ছেলে মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। আর নাতি নাতনী তো ডজন খানেক হবেই। গুরুদেব এসে উঠেছেন তাঁর বাড়িতে এবং দিব্য বিভূতি নিয়ে বৈঠকখানায় বিরাজ করছেন, গতকাল থেকে। গ্রামের আর সব বউ-ঝি, ছেলে-পুলে সবাই একেবারে হামলে পড়েছে পদধুলিতে ধন্য হওয়ার জন্যে। পুকুরে জাল পড়েছে। সর্বশ্রেষ্ঠ মাছটি তার মৎস্য জীবন ধন্য করবে গুরুদেবের পাত আলো করে। আর এখানেই চেলা, সুবলের মনে বড়ো খেদ। গুরুদেব যা বলেন, যখন বলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেটাই সে পালন করে, আর তার জন্যে বরাদ্দ কিনা লেজের ঠিক ওপরের কাঁটাওয়ালা সরু লিকলিকে মাছটুকু!মিষ্টি হোক কিংবা অন্য আর যে কোন উপাদেয়, তার ভাগে ওই নমো নমো। আর সিংহভাগ কিনা গুরুদেবের। সে যে অভিযোগ করেনি তা নয়। কিন্তু গুরুদেবের কর্ণকুহরে জাগতিক কোনো কথাই প্রবেশ করে না। শুধু,প্রকান্ড ভুঁড়িটায় জাগতিক খাবার প্রবেশের খামতি নেই এতটুকু। সে ফলারের এক মালসা খই-দুধ-কলা-মধু হোক কিংবা দুপুরের পঞ্চব্যঞ্জন সহকারে আস্ত একটা মাছ। কোনোটায় না নেই একেবারে। রাগটা অমূলক নয় সুবলের। একটা প্রতিশোধ স্পৃহা জমা হয়ে রয়েছে অনেক দিন ধরে। তক্কে তক্কে ছিল সে। কিন্তু সময় হয়তো, সুযোগ হয়না। আর সুযোগ মেলে তো সময়ের অভাব। দুটোই মিলে গেল এখানে। লম্বা পাঁচিল ঘেরা চওড়া উঠোন। আর সেখানেই শুকোচ্ছে এক মাদুর লাল টকটকে লংকা। পাশে দাওয়ায় শিল নোড়া রাখা রয়েছে। ধারেকাছে কেউ নেই। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। মোক্ষম এই সুযোগে বেশ খানিকটা লংকা বেটে নিয়ে কলাপাতায় মুড়ে, লুকিয়ে রাখলো সে। গুরুদেব রান্না করেন স্বহস্তে। লোকে যাকে স্ব-পাক বলে আর কি। রান্না শেষ করে,স্নান-আহ্নিক। তারপর ভরপেট পেটপুজো। গুরুদেব যেই স্নানে গেছেন সেই সময়টাতেই সুবল লংকার চালান দিয়ে দিল মাছের ঝোলে। খেতে বসে গুরু ঠাকুর শুধু উহ,আহ করছেন। তবে পেটুকের যেটা হয় আর কি। ফেলতেও পারছেন না। কষ্ট করে খেয়েই ফেললেন পুরোটা। লঙ্কাকাণ্ড শুরু হলো যখন, তখন প্রায় মাঝরাত। - " সুবল, ওঠনা বাবা। হ্যারিকেনটা নিয়ে দাঁড়াবি একটু। বড্ডো জোর বাহ্যে পেয়েছে।" -"আমি পারবো না। কে বলেছে তোমায়, এমন গান্ডেপিন্ডে গিলতে? আর সন্ধ্যেবেলায় শুনে এলুম, এখানে নাকি পেল্লায় এক বাঘ বেরিয়েছে আর সে নাকি এদের বাড়ির ছাগল তুলে নিয়ে গেছে। কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। গেলে, তুমি একলা যাও। তোমার জন্যে বাপ মার দেওয়া এই পরানটা বিসর্জন দিতে পারব না। একটু চেপেচুপে থাকো। সকাল হয়ে গেলে যাবে, এখন।" খানিকক্ষণ চুপচাপ। কিন্তু হাগা শোনে কি আর বাঘের ভয়! - "ও সুবল আমি আর পারছি না যে। কিছু একটা কর না বাবা।" - " কি করবো? এ্যাঁ। গেলার বেলায় তো নিজের জন্যে পুরোটা। তখন তো মনে থাকে না আমার কথা!আর এখন রাতদুপুরে বিদেশ বিভুঁইয়ে, বাঘের দেশে এসে বাঘের পেটে যাবো নাকি,তোমার জন্যে!" - "তবে কি করি বলতো?" - "এক কাজ করো। ফলারের মালসাটা ফাঁকা করে দিচ্ছি। ওতেই সারো। সকাল বেলায় বাঁশবাগানে গিয়ে, আমি না হয় মালসাটা ফেলে দিয়ে আসবো। কেউ টেরও পাবে না।" উপায়ন্তর না দেখে সেটাই মানতে হলো,তাঁকে। শুধু একবার নয়,পরপর তিন তিনবার। মালসা একবার ভরপুর,উপুচুপু। চারদিক প্রায় ফরসা হয়ে এলো। কাকপক্ষী সব ডাকাডাকি শুরু করেছে। কিন্তু, সুবলের ওঠার নাম নেই। "ও সুবল, সকাল হয়ে এলো। যা বাবা, মালসাটা ফেলে দিয়ে আয়।" যাচ্ছি, যাচ্ছি করেও ওঠার নাম নেই তার। অগত্যা, গুরুদেবকেই উঠতে হলো। গায়ে চাদরখানা চাপিয়ে তার তলায় মালসা নিয়ে। দরজা খুলে যেই তিনি পা বাড়িয়েছেন বাঁশ বাগানের দিকে, অমনি সুবল গিয়ে খবর দিল সনাতন বাবুর বড়ো ছেলেকে,"একি আপনারা ঘুমোচ্ছেন এখনো! ঠিক করে যত্ন আত্তি করেননি তো,তাই, গুরু ঠাকুর যে রাগ করে চলে যাচ্ছেন, ওই বাঁশ বাগানের দিকে। খবরটা পেয়েই তো সবাই পড়ি মরি করে ছুটলো বাঁশ বাগানের দিকে। গুরুদেব যতই বোঝাতে চেষ্টা করেন যে রাগ করেননি তিনি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সবাই মিলে হাতে পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি। টলমলে টইটুম্বুর মালসা কতক্ষণ আর এ ধকল সহ্য করতে পারে! ফলত যা হবার তাই, একসময় সেই গন্ধমাদন ফেটে চারদিক একেবারে..... বলা বাহুল্য, তার পর থেকে গুরু আর চেলার ভাগাভাগি হয়ে উঠলো বরাবর, সমান সমান।

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment