Avatar

ধর্ম, সংস্কার ও নারী স্বাধীনতা

দেবপ্রসাদ বসু (উপাসক)

ধর্ম, সংস্কার ও নারী স্বাধীনতা -------------------*-------------------- দেবপ্রসাদ বসু ৯/০৩/২০২১ কথাটা ছিল, ঋতুকালীন অবস্থায় বাড়িতে মন্ত্রপাঠ সহ স্বরস্বতী পুজো ক'রে ফেসবুকে ভিডিও পোষ্ট কী নারী স্বাধীনতার প্রকৃত আন্দোলনে ইন্ধন জোগানো যায়? সেটা কী সমীচীন বা ন্যায়সঙ্গত? কথাটির এককথায় উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। সে কথা প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয়, শরীরের ধর্ম, আত্মার ধর্ম ও প্রবৃত্তির ধর্ম এবং সংস্কার, কুসংস্কার ও মানব সমাজ একটি অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। চেতনার বা বোধের তারতম্য অনুযায়ী বিচার, তর্ক বা মতান্তরের তফাৎ হতেই পারে। সে সব কথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বলা যেতে পারে, সমাজে কুসঙ্কার আছে, সংস্কারও আছে। তাবলে নিজ নিজ ইচ্ছার মাপে সংসারকে কুসংস্কার ব'লে দাগিয়ে দেওয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। অতি আধুনিকতার দোহাই দিয়ে গুলিয়ে দিতে চাইলেও বোধহয় ন্যায়সঙ্গত হবে না। প্রকৃত ধর্ম বিজ্ঞানসম্মত। সেটা মনোবিজ্ঞানের বিষয়। এককথায় ধর্মবিজ্ঞান বলে। কাঠ-আকাঠের গল্পের মতো বা বোধ-অবোধের দ্বৈরথের মতো যুক্তির ধার না ধেরে তর্ক -----, সময় ও মেধার অপব্যয় বলেই মনে হয়। চিন্তার অপচয়ও বটে। বস্তুত, আত্মার সাথে পরমাত্মার বা অপুরুষ্ট চিন্তার সাথে পুরুষ্ট চিন্তার মিলন বা যোগই জ্ঞানের চরম স্থান ও অবস্থা। অমাবস্যার পর প্রতিপদের চাঁদের পূর্ণিমায় মিশে যাওয়ার মতো। সেই জ্ঞানের আধারপ্রাপ্ত মানুষই যোগী পদবাচ্য বা মহাপুরুষ বা মহামানব পদবাচ্য। তখন জ্ঞানের সেই পর্য্যায়ে তাঁরা প্রবৃত্তি মুক্ত নিরপেক্ষ বিচার দক্ষ বা দর্শনের অধিকারী হন। তাঁদের অন্তর্দৃষ্টি নিহিত মানব কল্যাণের স্বার্থে বিধি বা বিধানই শাস্ত্র। কিন্তু পরবর্তীকালে যোগী নয় অথচ পুরোহিতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু মানুষের দ্বারা দুধে জল মেশানোর মতো শাস্ত্রে অভিসন্ধি বা জনস্বার্থ বা সমাজ স্বার্থের সাথে আত্মস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ মিশিয়ে সমাজ শোষণের যে বিধি ব্যবস্থা ধর্মের নামে চালানোর চেষ্টা হয়েছে সেগুলোকেই কুসংস্কার বলা যেতে পারে। তাই ব'লে পুরো শাস্ত্রটাই কুসংস্কার নয়। স্বেচ্ছাচারিতা যেমন স্বাধীনতা নয় ঠিক তেমনি অত্যাধুনিকতাও আধুনিকতা নয়। নিয়নের আলো আবিষ্কার ক'রে চাঁদের জ্যোৎস্না ব'লে চালিয়ে দিলে তো আর চলবে না! কোটি কোটি বছর পার হয়ে গেলেও চাঁদ সূর্যের বিকল্প যেমন হবে না ঠিক তেমনই প্রকৃত শাস্ত্রের সমাজ শোধনকারি উপযোগিতার বিকল্প হবে না। আজকের দিনের সমাজ বড়ই চিত্ত চঞ্চল। চঞ্চল মন কোনও কিছুই যুক্তি দিয়ে বিচার করতে পারে না। সেজন্য স্থির মনের প্রয়োজন। যেমন, বালতির জল নড়লে তার মধ্যের চাঁদের শরীরের ছায়া ভাঙা ভাঙাই দেখায় যতক্ষণ না জল স্থির হচ্ছে। তাই জীবনের উদ্দেশ্য হ'লো স্থির মনের সাধনা করা। অস্থির মন সভ্যতা নষ্টের কারিগর। যা কিছু অসাম্য সমাজে আজ চলছে বা সংঘটিত হচ্ছে তার সবটাই চঞ্চল মন বা অস্থির চিত্তের কার্যকলাপ। একথা ঠিক, হিন্দু সমাজে সতীদাহ ও বাল্যবিবাহ পূর্বে উল্লিখিত স্বার্থের বহিঃপ্রকাশ কুসংস্কার বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে কিন্তু ঋতুকালীন অবস্থায় শুদ্ধাচার থাকে না এবং সে সময়ে ঈশ্বরের পূজাপাঠ বা আরাধনায় তাই শুদ্ধতা লঙ্ঘিতই হয়। শারীরিক শুদ্ধাচার মনের শুদ্ধাচারের প্রথম সোপান। মন শুদ্ধ হলেই সব শুদ্ধ, কথাটা তাই গা-জোয়ারী। মন শুদ্ধ হওয়া বা রাখা তাই খুব একটা সহজ কথা বা কাজ নয়। কোনও কথা -----, স্বত্ত্বা নিহিত হৃদয়ের বাণী নাকি, প্রবৃত্তি পরিচালিত বাণী, এটা জানা ও বোঝা বা অনুধাবন করা দরকার। এবার আসা যাক শরীর তত্ত্বের খুঁটিনাটি বিষয়ে যৎসামান্য আলোকপাতের মাধ্যমে। জন্মগত ভাবে নারী শরীরে আসা কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণুর মধ্যে একটি-একটি ক'রে ডিম্বাণু প্রাপ্তবয়স্ক হয় নারী শরীরের একটি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছে, সেটা গড় মাপে প্রায় বারো বছর। তখনই মেয়েদের শরীরে ঋতুচক্রের শুরু। সেখান থেকেই মেয়েদের মহিলা হয়ে ওঠার সূচনা। ঠিক তখনই প্রতি মাসে ফেলোপেন টিউবে একটি ডিম্বাণুর আবির্ভাব হয় একটি শুক্রাণুর সাথে মিলিত হওয়ার আশা ক'রে। ক্ষুধিত বা তৃষিত ডিম্বাণুর সেই শুক্রকীট প্রার্থনা করার পর বিফল হলেই আঠাশ দিনের মাথায় তার অপমৃত্যু ঘটে। কেননা, সেই প্রতীক্ষার মেয়াদ মাত্র আঠাশ দিন। তখনই মেয়েরা বা মায়েরা ঋতু সম্পূর্ণ করে। তারপর আর একটি ঋতুচক্রের শুরু। এটা চলতে থাকে কম বেশি পঞ্চাশ বছর বয়স অবধি। সেই মৃত ডিম্বাণু মৃত রক্ত কণিকার সমষ্টি যথার্থ অর্থেই মল মূত্রের মতোই শরীরের দূষিত কণা-র সমাহার বর্জ্য পদার্থ। তাই তাকে দল বেঁধে গায়ের জোরে আদরণীয় ক'রে তোলার কোনও কারণও দেখি না। শরীরতত্ব ও শরীরের ধর্ম এবং মনের ধর্ম ও আত্মার ধর্ম ও প্রবৃত্তির ধর্ম সবই আলাদা। তাই কোনও প্রকার দ্বন্দ্ব বা তর্কে জড়ানো উচিত নয়। যে বা যিনি যতটা বুঝবে বা বুঝবেন সেখানে সন্তুষ্ট থাকাই শ্রেয় বলেই মনে হয়। তাই বলি, সমাধান হ'লো জানাতেই। জ্ঞানই তর্কের অবসান ঘটায়। ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের কথায়, কলসিতে জল পূর্ণ হলে আর জল ভরার শব্দ থাকে না। আজকাল লহমায় নিজের পরিচিতি বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় আলটপকা মন্তব্য ক'রে বা কিছু আপযুক্তিগ্রাহ্য ভিডিও প্রকাশ ক'রে অনেকেই প্রচারে আসতে চাইছে বা চাইছেন দ্বন্দ্ব তর্ক মতান্তর সৃষ্টি ক'রে একসাথে বহু সংখ্যক মানুষের দৃষ্টি সংগ্রহের আশায়। কিন্তু এটা তো ঠিক, উচ্ছিষ্টকে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ঢাকলে সেই উচ্ছিষ্ট আর গোলাপ ফুল হয়ে যায় না। কিম্বা, সমাজে সংসারে অসংখ্য দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বেছে বেছে যুক্তি হোক বা অপযুক্তি হোক নিজের মতামত অনুসারী কথা বা মতামত গুলোকে বেছে নিয়ে হিতকরী বিষয়ের উপর ঝাঁপিয়ে প'ড়ে নিজ মতের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে সেটাকেও এক ধরনের চিন্তার কুসংস্কার বলা যেতেই পারে। তাই জেনে মতামত বা না জেনে মতামত কিম্বা কম জেনে মতামত প্রদানের যুদ্ধ সেই আবহমান কাল থেকেই ধারাবাহিক ভাবেই চলে আসছে এবং আজও তা বিদ্যমান। সে সব বিজ্ঞান সম্মত মতামতের সামনে ক্ষমতার সংখ্যাধিক্যের অসাম্য মতের দাপটের শিকার তাই যিশুখ্রিস্ট, সক্রেটিস, গ্যালিলিও ইত্যাদিই জাজ্বল্যমান প্রমাণ। * * * * *

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment