Avatar

শেষ বিকেলের রং

Santana Saha

বিভাগ - গল্প শিরোনাম - শেষ বিকেলের রং - সান্তনা সাহা © Copyright protected মণিকাদেবীর একমাত্র মেয়ে শম্পা। জন্ম থেকেই বিকলাঙ্গ। দুটো হাত অচল তার। মেয়েকে জন্ম দেবার পর থেকে মণিকাদেবীর কপালে যেমন কম লাঞ্ছনা জোটেনি তেমন শম্পার কপালেও ভাটা পড়েনি তার। জনমদুখী মেয়েটা রোজ চোখের জল ফেলত। কিন্তু মণিকাদেবী বুঝতে পারতেন তার মেয়ের মেধা আছে। তাই ঘরের ভিতরেই তাকে পড়াতেন। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে বাড়ির বাইরে তাকে খুব একটা বের করতেন না। তাই স্কুলে ভর্তি হবার সৌভাগ‍্য কোনদিন হয়নি শম্পার। আরেকটি ছেলেও ছিল মণিকাদেবীর। নাম ছিল রূপক। সে ছিল সুস্থ। দেখতেও ছিল সুন্দর। পাড়ার সকলে তার দিদির সামনেই তার প্রশংসা করত আর তার দিদির প্রতি তির্যক মন্তব‍্য করে ঠোঁট বাঁকাত। তাতে দিন দিন রূপকের গর্ব বেড়েই চলে। সেও তার দিদিকে তাচ্ছিল‍্য করতে শুরু করে। শম্পার খুব শখ হত হোলি খেলার। হোলির দিন সে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখত কত ছেলেমেয়ে রং নিয়ে খেলছে। কিন্তু তার যে কাউকে রং দেবার ক্ষমতা নেই। কেউ রং মাখাতেও আসত না তাকে। বুকে জমে থাকা কষ্টটায় পাথর চাপা দিয়ে সে জানালার পর্দা ফেলে দিত। দেখতে দেখতে শম্পার বয়স বাড়তে থাকে। বিকলাঙ্গ হবার কারণে বিয়েও হয় না। একসময় তার বাবাকেও হারায় সে। তার ভাই রূপক নিজে পছন্দ করে একটি মেয়েকে বিয়ে করে। মেয়েটা তার সঙ্গে একই অফিসে চাকরী করত। কিন্তু ভাইবৌ আসার পর থেকে শম্পার কপালে জোটে মাত্রাধিক লাঞ্ছনা। রূপকও এর কোন প্রতিবাদ করত না। সে তখন তার বউয়ের প্রেমে পাগল। নিত‍্যদিন তার কাছে অপমানিত হতে হতে একদিন সহ‍্যের বাঁধ ভাঙে শম্পার। সে আত্মহত‍্যা করতে যায়। কিন্তু তার মা দেখতে পেয়ে তাকে বাঁচায়। এই অশান্তির হাত থেকে মেয়েকে বাঁচাতে চিন্তাগ্ৰস্থ মণিকাদেবী তাকে একটি অনাথ আশ্রমে পাঠাবার ব‍্যবস্থা করে। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে মেয়েকে সেখানে রেখে আসে। রূপক কোন দিন জানতেও চায়নি ঐ আশ্রমের ঠিকানা। দেখতে দেখতে সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে। মণিকাদেবীও গত হন। রূপকের একটি ছেলে হয়। তার নাম আবীর। সেও আস্তে আস্তে বড় হয়ে যায়। সে জানতেও পারে না যে তার এক পিসিও আছে। এদিকে শম্পা যে আশ্রমে থাকত সেখানে নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। এখানে থাকতে থাকতে শম্পা ভীষণ সুন্দর ছবি আঁকতে শেখে। তার হাত দুটো তো ছিল বিকল তাই সে ছবি আঁকত পা দিয়ে। আস্তে আস্তে তার বিভিন্ন ছবির প্রদর্শনী শুরু হয়। অনেক দামে তার ছবি বিক্রি হয়। একদিন শহরের এক নামী আর্ট গ‍্যালারিতে তার ছবির প্রদর্শনী চলছে। তখন তার ভাইপো আবীরের তার আঁকা একটি ছবি এত ভালো লাগে যে সে কিনে নিয়ে যায়। বাড়ি গিয়ে বাবার কাছে ছবির শিল্পীর নাম বলাতে রূপকের সন্দেহ হয়। দুবছর আগে স্ট্রোক হয়ে রূপকেরও দেহের উর্ধ্বাংশ প্রায় পঙ্গু। দুটো হাত অচল। সে তখন অনুতপ্ত। তার হারানো দিদিকে ফিরে পাবার জন‍্য অদম‍্য আকাঙ্ক্ষা হত । কিন্তু কোন উপায় ছিল না। সে পথ তো সে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছিল। সে মরিয়া হয়ে আবীরকে বলল, আমায় নিয়ে যাবি ঐ শিল্পীর কাছে? তখন সব কথা জানতে পারল আবীর। শম্পা আর রূপক মুখোমুখি হবার পর কোন কথা বলতে পারে না। শুধু তাদের চোখ বেয়ে অবিরাম অশ্রুধারা পড়তে থাকে। দিনটি ছিল হোলির দিন। হঠাৎ আবীর এক থালা আবীর নিয়ে এসে বাবা আর পিসিকে মাখিয়ে দেয়। হঠাৎ এই আশাতীত পরমপ্রাপ্তিতে শম্পার দুচোখ আনন্দে নেচে ওঠে। সে বলে, আমার এমন কপাল যে হোলির দিনে একমাত্র ভাইপোকে একটু রংও দিতে পারব না। রূপক বলে, এখন তো আমারও একই অবস্থা। তখন আবীর বলে, তোমাদের দুভাইবোনের এই খুশী দেখে আমার হৃদয় যে এমনিই রাঙিয়ে গেছে গো। এ রং যেন মোর মর্মে লাগে। আমি যেন কখনও কোন বিকলাঙ্গ মানুষকে অশ্রদ্ধা না করি।

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment