Avatar

সভ্যতার পুঁজি শ্রম

দেবপ্রসাদ বসু (উপাসক)

সভ্যতার পুঁজি শ্রম -----------*------------- দেবপ্রসাদ বসু ১/০৫/২০১৯ প্রবাদ আছে, আমরা গঙ্গা জলে গঙ্গাপুজো সারি। মাছের তেলে ভাজি মাছ। আর একটা প্রবাদ হতে পারে, শ্রমিকের শ্রমে ক্ষমতার আস্ফালন দেখায় সমাজ। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা, দুর্বল মানুষের শ্রমের রসদে তাকে অনুদান দিয়ে টিকিয়ে রাখে পরবর্তী ও আজীবন শ্রম দোহনের স্বার্থে। সত্যি কথা বললে কেউ কেউ বলবে অভিসন্ধি মূলক কথা। আসলে সভ্যতা নামক ব্যবস্থাটার কাজ-ই হ'লো, শ্রম লুন্ঠন আর সাধু সাজা কথার কারসাজি বিতরণ ক'রে মানুষকে ভুল বোঝানো আর যথেচ্ছ ব্যবহার ক'রে নেওয়ার প্রচেষ্টা। অন্যের শ্রম, সম্মান সবই শঠতার থাবায় আষ্টেপিষ্টে ধরবে কিন্তু নিজে থাকবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। জল জলজ পশু পাখি অরণ্য খনিজ আর মানবসম্পদ নামক বস্তুটির শ্রম পুঁজি করেই তথাকথিত সমাজের বাড় বাড়ন্ত হম্বিতম্বি রমরমা। তারা ঐক্যের ডাক দেয় ঐক্য ভাঙার ফন্দি কৌশল জারি রেখে, জিইয়ে রেখে। যদি উচিত কথাটা কেউ বলে তাহলে রে-রে ক'রে আসবে অনুচিত কাজ করে যারা। তাদের বুদ্ধি বেশি সরলমনা মানুষের চাইতে। কথায় বলে বা একটা স্লোগানের জন্ম হয়েছে মুখে মুখে প্রচারিত যা, তা হ'লো, দুনিয়ার শ্রমিক এক হও। কিন্তু শ্রমিকের মধ্যে বৈষম্য ঘটিয়ে ঐক্যে ফাটল ধরানোর ব্যবস্থা করা আছে সুচারুভাবে। শ্রমিক শ্রমিকে আয়ের তফাৎ। একই কাজের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে আয়ের তফাৎ। তার ওপর আছে কাজের ক্ষেত্রে সংগঠিত শ্রমিক ও অসংগঠিত শ্রমিকের সুযোগ সুবিধা নিরাপত্তার তফাৎ। ধরা যাক মুক্ত বাণিজ্য অর্থনীতিতে ভর্তুকি উঠিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে ধীরে ধীরে। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই একযোগে বলবে বা প্রতিবাদ করবে ভর্তুকি উঠিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। লড়াইয়ের একটা জমি তৈরি হ'লো মজবুত কেননা সংখ্যা গরিষ্ঠ-এর প্রতিবাদ সাধারণত বেশ জোরালোই হয়। কিন্তু যে মুহুর্ত্বে আওয়াজ উঠবে দেশে অর্থনীতির স্বার্থে যাদের ডি. এ. আছে তাদের জন্য ভর্তুকি থাকবে না ঠিক তখনই ভিতর থেকে আওয়াজকারীর বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠবে বিচ্ছিন্নতাবাদীর তকমা সেঁটে। হিংসা ছড়ানোর দুর্নাম রটিয়ে। একটা কথা তো ঠিক, ঐক্য চাই কিন্তু সেটা হওয়া দরকার সততার ঐক্য, প্রকৃত সাম্যবাদী ঐক্য, মিলেমিশে প্রাপ্য ভোগের ঐক্যের ভাবনা। সাম্যবাদের কথা বলবো, স্লোগান তুলবো আর কুক্ষিগত মনোভাব থাকবে তার অন্তরালে তাহলে মে-দিবস বা শ্রমদিবসের লড়াইয়ের ডাক শুধু কথার কথায় থেকে যাবে, থেকে যাবে নিছক স্লোগানে, কাজের কাজ কিছুই হবে না। দশ জনেরটা একজনে ভোগ করা, লড়াইটা তার বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না ভ্রান্ত বিপ্লবের জন্য। তাই দিনে দিনে কোটিপতি, কোটি-কোটিপতির সংখ্যা উর্ধমুখী। দরিদ্র আরো দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। কর্ম নেই, যা আছে তার নিরাপত্তা নেই। নিরাপত্তা নেই যেখানে সেখানেই বারগেনিং, ইচ্ছেমাফিক শোষনের পথ উন্মুক্ত। আমরা দেখি, শুনি, বুঝি আর না বোঝার ভানে উপভোগ করি। সত্যি যদি মানুষের উপকার করতে হয় তাহলে অনুদান-ভিক্ষে কেন, সে পয়সায় শিল্প গ'ড়ে তাকে স্বাবলম্বী হতে দেবোনা কেন? এটা মুখাপেক্ষী ক'রে রাখার চিরস্থায়ী কায়েমী ব্যবস্থা নয় কি? মে-দিবসের উন্মাদনা ও তা পালনের উপকারিতা আগে যা দেখেছি এখন তা অনেক ফিকে হয়েছে। আটঘন্টা কাজ আজ প্রায় উঠেই গেছে। দশ বারো ঘন্টা খাটিয়ে নিচ্ছে কর্পোরেট পুঁজি, চাকরি ও চাকরিপ্রার্থীর চাহিদা জোগানের ভারসাম্যের ঘাটতির কারণে। কিছু না পেলে মানুষ হাতের কাছে যা পায় তাই-ই করে বা করতে বাধ্য হয়। তার নিজেকে বাঁচতে হবে এবং বাঁচাতে হবে তার ওপর নির্ভরশীল মুখাপেক্ষী দুর্বলদেরকে। মুক্ত বাণিজ্য অর্থনীতিতে যতই ভর্তুকি কমছে ততই মাইনে বাড়ছে ডি.এ. ওয়ালা মাইনের চাকুরীজীবিদের। পাশাপাশি বাজারদর বাড়ছে অসংগঠিত কর্মচারীদের পক্ষে যা সামাল দেওয়া কার্যতই অসম্ভব। বাড়ছে সংগঠিত ক্ষেত্রের চাকুরীর বাজারদর, সাথে সাথে বাড়ছে সেই চাকুরী পেতে ঘুষের বহর। এবং তা দরিদ্র মেধাবীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ওপর রয়েছে আবার কোটা সিস্টেম বা সংরক্ষণ। এ যেন নীতির গোলকধাঁধায় ঘুরে মরা, ঘোরানোর কৌশল ক্ষমতা ও পুঁজির মিলিজুলি প্রয়াসে। আমেরিকা, যাকে অনেকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ ব'লে শ্লেষ করে সেই আমেরিকাতেই শ্রমিক আন্দোলনে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে হে-মার্কেটে আট জন শ্রমিকের আত্মবলিদান স্মরণে রেখে উদ্বুদ্ধ হয়েই আমরা মে-দিবস পালন করি পরবর্তী প্রজন্মের শ্রমিকের স্বার্থে, সুষ্ঠ শ্রম বন্টনের স্বার্থে। কিন্তু দেখা যায় আমরা ক্ষুদ্র স্বার্থে বা শোষণ প্রকল্পের চাপে আপনি বাঁচলে বাপের নাম রাখতে ঐক্য ভেঙে ফেলি। পোয়াবারো সেই পুঁজি ও ক্ষমতা-ব্যবসায়ীর। একথা সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই যে স্বাধীনতার লড়াই লড়া বীর শহীদের আত্মত্যাগ তার কি মূল্য দিই। তা যদি দিতাম তাহলে সমাজের আজ এই বৈষম্য অরাজক অবস্থা হতো না। * * * * *

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment