Avatar

হতাশা রোদ্দুর

দেবপ্রসাদ বসু (উপাসক)

হতাশা রোদ্দুর ---------*--------- দেবপ্রসাদ বসু ১২/০৫/২০২০ একটিই ঘর প্রতিধ্বনির। একই ঘরের মধ্যে টি.ভি, দু'টি ছেলে-মেয়ের চিৎকার চেঁচামেচি, বউয়ের এটা আনো ওটা আনো ফরমায়েশ মেটাতে পাড়ার দোকানে যাওয়া, কত না বিড়ম্বনা। দোষের মধ্যে দোষ তার একটু লেখালিখির নেশা আছে। এমনিতে তো সপ্তাহে সাড়ে ছয় দিন আফিস থাকে। তার মধ্যে অর্দ্ধদিন আফিস যেদিন সেই দিনটাকে সে ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না কেননা তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বার হতেই হয় যখন। সব থেকে বড় কথা প্রতিধ্বনির স্ত্রী প্রনতা আবার অত্যধিক বাস্তববাদী। তার মত, যে কাজে অর্থ নেই, যশ অর্থাৎ খ্যাতি নেই সে কাজ মূল্যহীন, পন্ডশ্রম। বরং সেই সময়টুকুতে আরো কিছু আয় বাড়িয়ে নেওয়া যেত। সেই সূত্রে প্রতিধ্বনির রুচি আদর্শ নীতির পরিপন্থী পরিবেশ বাড়িতে। স্বামী স্ত্রী উভয়েই একই মানসিকতার মানুষ না হলে সংসারিক জীবনে বা দাম্পত্য জীবনে তেমনভাবে গতি আসে না। দুই পাখনায় আর ওড়া যায় না। মনটা তাই মাঝে মাঝে বিমর্ষ হয়ে থাকে প্রতিধ্বনির। লাভের মধ্যে লাভ, এই সব চিন্তাগুলো দিয়ে তার কিছু কবিতা, গল্প সৃষ্টি হয়। কবিতা গল্পের উপাদানই তো এই সব অসম বিষম ঘটনা। এবং বলবার বিষয়, লেখার উপাদানগুলো বাস্তব ঘটনা ব'লে বেশ বলিষ্ঠ হয় তার সাথে জোরালো অনুভূতিপ্রবণ কল্পনার মিশেলে। প্রনতা কথায়-কথায় স্বামীকে কথা শোনায় পানের থেকে চুন খসলে অর্থাৎ সংসারের কোনও কাজের কথা বললে লেখালিখির কাজে ডুবে থাকা মনে যদি স্ত্রীকে বলে ফেলে, দাঁড়াও না! একটু ধৈর্য্য ধরতে পারছো না? ব্যাস! আর যায় কোথায়। ওমনি রণচণ্ডী রূপ। কথার ফুলঝুরিতে অন্নপ্রাশনের ভাত তুলে দেওয়ার জোগাড়। একই কথার টেপ-রেকর্ডার বাজিয়ে যায়। খুব বড় লেখক হয়েছ একেবারে! যেন রবীন্দ্রনাথ গিয়ে কবিন্দ্রনাথ এসেছেন। তা এত যখন বড় কবি সাহিত্যিক হয়েছ তখন রবীন্দ্রনাথের কবিজীবন সম্পর্কে কিছু না কিছু পড়েছ, জেনেছো নিশ্চয়? জানো না, রবীন্দ্রনাথ জমিদারি সামলে কত ঝক্কি মিটিয়ে তবেই লিখতেন? তাই নাকি! তুমি সব জানো? না জানার কি হয়েছে। পড়লেই জানা যায়। তোমার তো আরো বেশি করে পড়া উচিত। না প'ড়ে কি আর তেমন উচ্চমূল্যের লেখা সম্ভব। আসলে তুমি আমাকে মানুষ মনে কর না বলেই ওরকম ভাবছ ও বলছ। আমিও যে কিছুটা লেখাপড়া শিখেছি এবং মাঝে মধ্যে কিছু পত্রিকা-টত্রিকা পড়ি একথা জানো নিশ্চয়। সেসব প'ড়ে আমিও কিছু কম জানিনা। মুখে সবসময় প্রকাশ করি না তাই। আসলে তুমি নিজের জানাকে এত বড় ক'রে দেখো যে আমার জানাকে পাত্তাই দিতে চাও না। এখন যেটা পাকিস্থান হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে সেই দেশে শিলাইদহে জমিদারি ছিল তাঁদের। এমনও শুনেছি, হয়ত দোতলায় ব'সে একমনে কবিতা লিখছেন এমন সময় নিচতলায় ডাক পড়লো প্রজাদের কেউ-কেউ দেখা করতে এসেছেন। কবি লেখা থামিয়ে নিচতলায় নেমে এলেন, প্রজাদের সাথে কথা বললেন, তারপর যথাস্থানে ফিরে এসে কিছুটা লেখা কবিতার শরীর সম্পূর্ণ করলেন। কি আশ্চর্য! যে ভাবনা ও উচ্চ বোধে কবিতাটা লিখছিলেন পরবর্তী লাইনগুলোও ঠিক সেই উচ্চতায় বা বোধে লিখে শেষ করলেন। পারবে তুমি। মিছিমিছি জায়গার অভাব, লেখার বা লেখার জন্য মন একাগ্র করা পরিবেশের অভাবের দোষ দিচ্ছ, কোলাহলের দোষ দিচ্ছ। প্রতিধ্বনি বলল, কোথায় রবীন্দ্রনাথ আর কোথায় আমি। তাঁর সাথে আমার তুলনা করছ? তাঁদের জমিদারি ছিল, টাকা পয়সর অভাব ছিল না। আর আমাদের নূন আনতে পান্তা ফুরোয়। খালিপেটে যেমন ধর্ম হয় না, ঠিক তেমনই ফুটো পকেট নিয়ে সাহিত্যে কলমের কেরামতি চলে না। এতই যদি বুঝেছ তা সারাদিন সংসারের দায়িত্ব কর্তব্য অবহেলা করে ওসব ছাইপাঁশ লিখে যাচ্ছ কেন, যা দিয়ে না লাভ হবে ইহকাল না লাভ হবে পরকালের। বেশি বোকো না, যা জানোনা, বোঝনা সে বিষয়ে বাড়তি কথা ব'লো না। রবীন্দ্রনাথ হবো না জেনেও ভিতরে যে শক্তি যতটুকু মাথাচাঁড়া দেয় তাকে সময়মতো ধরতে হবে তো। নইলে অন্তর আত্মাকে অপমান, অবমূল্যায়ন করা হবে। তা ছাড়া যখন যে ভাব বা ভাবনার উদয় হয় মনে তখন তাকে ধরতে না পারলে সেই ভাব বা ভাবনা পরে শত চেষ্টা করেও স্মৃতিতে আনা যায় না। সময় তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না, তোমাকেই সময়ের অনুসরণ করতে হবে। ধরো, তোমার সামনে দিয়ে কোনো পাখি উড়ে যাচ্ছে, তখন হাতের কাজ ফেলে তাকে ধরতে হবে। যদি ভাবো, কাজ সেরে তবে পাখি ধরবে, সে গুড়ে বালি। এটা যারা লেখালিখি করে বা রীতিমতো সাহিত্যচর্চা করে তারাই বুঝবে। অন্য কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এসব কথা বলে একটু থামলো প্রতিধ্বনি। তারপর বলল, দেখো, তোমাদের এইসব টাকা পয়সা বাড়ি গাড়ি দিয়ে মৃত্যুর পর কে কাকে চিনবে। মানুষ মানুষকে মনে রাখে তার গুনে, তার কাজে। সাহিত্য হচ্ছে একটা সমাজসেবামূলক সমাজসচেতন সমাজ সংস্কারমূলক মহৎ কাজ। তাই নাকি? আপনি বাঁচলে বাপের নাম। আগে ভালোমতো দু-মুঠো খেয়ে প'রে বাঁচি। একটু ভালো ঘরদোরে শুই, তারপর তো পরকালের চিন্তা। পায়ের তলায় মাটি নেই তা আবার আকাশ খোঁজার ভাবনা। খুব অপমান লাগল প্রতিধ্বনির। মনে-মনে ভাবতে থাকেলো, তার দ্বারা বুঝি আর কিছু হ'লো না। অন্তরআত্মা তাঁকে যেটুকু আবেগ অনুভূতি কল্পনাশক্তি দিয়েছেন আশীর্বাদস্বরূপ, তা বুঝি মাঠে মারা গেল অবস্থার বিপাকে, অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতির অভাবের কারণে। কেন এমন না দেওয়ার দান দিলেন তাকে তা আজ অবধি ভেবে সদুত্তর পায়নি সে। সম্ভাবনা দিয়েছেন কিন্তু সুযোগ দিলেন না। বীজ দিয়েছেন কিন্তু মাটি দিলেন না। উপযুক্ত, উর্বর মাটি তো দূরের কথা। মন ভারি হয়ে এলো তার। চোখে জল এলো না ঠিকই তবে মনে ঝর্না ধারার উষ্ণ প্রস্রবণ বইতে থাকলো। তাকে চুপ ক'রে থাকতে দেখে প্রনতা বলল, কি গো! কি এত ভাবছ? হঠাৎ চুপ মেরে গেলে যে বড়! কথা বলল না প্রতিধ্বনি। হাতে থলিটা নিয়ে মানিব্যাগটা জামার পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে গেল পাড়ার দোকানের উদ্দেশ্যে। থমথমে হয়ে গেলো বাড়ি। চুপ হয়ে গেল ছেলেমেয়েরা। এরকম মাঝে মধ্যেই হয়। অভাবের মধ্যে সাহিত্যচর্চা বাহুল্যতা যেন। কিন্তু সে তো আর মদ গাঁজা জর্দাপান ইত্যাদি খায় না। সিগারেট বিড়ি টানে না। গুটকা গুড়াকু খইনি নস্যি কিছুই ব্যবহার করে না। করে না বলেই সেই অর্থ সংসারে খরচ ক'রে সবসারের অভাবে কিছুটা হলেও স্বচ্ছলতা আনে। এটা কি তার অবদান নয়, আত্মত্যাগ নয়! হ্যাঁ, খাওয়ার মধ্যে দুবেলা দুই কাপ সস্তার চা খায়। সস্তার চা বলতে কমদামের চা-দানা কখনও গুঁড়ো দুধে কিম্বা কখনও লিকার চা খেয়ে নেয়। এই সাহিত্যচর্চা ছাড়া তার আর কোনও নেশা নেই। এটা সে জেনেছে বা বুঝেছে, সমাজে প্রায় প্রতিটি মানুষের কোনও না কোনও কিছু না কিছু নেশা থাকে। নেশার কথা মনে আসাতে ভাবলো, নেশা কি আর এক ধরনের! আগের ভাবা নেশাগুলো ছাড়াও টাকার নেশা, মেয়ে মানুষের নেশা, বিষয় আশয়ের নেশা, চুরিদারি নেশা, লোক ঠকানোর নেশা, কত না অগুনতি নেশা আছে মানুষের মনে। আরও আশ্চর্য্য! কোন মানুষ যে কোন নেশায় কাবু তা কে বলতে পারে। প্রতিধ্বনি ভাবে, নেশা আর কিছুই নয়, নেশা হ'লো কোনও বিষয়ের প্রতি মনের টান, আকর্ষণ বা আসক্তি থেকে মনকে সরিয়ে আনতে পারার অক্ষমতা মানুষের সত্ত্বার। কিছু জন্মগত, কিছু পরিবেশ-পরিস্থিতির পাশাপাশি কার্য্য কারণগত। এসব নেশার কোনোটাই তার নেই। নেশা বলতে সাহিত্য এবং সংসার। যে রকমই লিখুক না কেন, প্রতিধ্বনির কিছু কিছু লেখা কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। আজকাল এন্ড্রোয়েড মোবাইল ফোনের দৌলতে নেট-পত্রিকা এবং ফেসবুক-পত্রিকা গুলোতে লেখা প্রকাশিত হয়। একটা বিষয় হ'লো, যখন যা মনে আসে কবিতা গল্প প্রবন্ধ ছড়া সব কিছুই লেখে সে। জীবনযুদ্ধের চাপে সময়ের অভাবে উপন্যাস লেখা তার আর হয় না। তার মনে হয় সময় সুযোগ পেলে সে কিছু উপন্যাস লিখতে পারতো। এ বিষয়ে মাথায় সর্বক্ষণ কিছু প্লট ঘোরে তার। এটাও ঠিক, উপন্যাস না লিখতে পারলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সাহিত্যের হাটে কলকে পাওয়াও মুস্কিল। যে সব গল্পগুলোর সাহায্যে সিনেমা বা ছায়াছবি কিম্বা আজকাল টিভি সিরিয়াল গুলো নির্মিত হয় সেগুলো সবই উপন্যাস। লিখতে-লিখতে দান লেগে যেতে পারে। একবার একটা উপন্যাস দাঁড়িয়ে গেলে বা বাজারে খেলে, নাম-সুনাম সাথে অঢেল টাকা আসে ঘরে। তখন তার আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। সে ভাগ্য কি আর তার হবে এই জীবনে! তার ওপর ঘরের মানুষের সহযোগিতা নেই। আবার ভাবে, তারও বা দোষ কি। ছেলে মেয়েদের মুখে সময়মতো খাবার তুলে দিতে হয় তাকে। প্রণতার কথামতো, রান্নাঘরে থাকে যে অর্থাৎ রান্নাঘর সামলায় যে তারই যত জ্বালা। মা খেতে দাও বললেই মায়ের মনে চাপ পড়ে যদি ঠিকঠাক খাবার ছেলে-মেয়ের মুখে সময়মতো যোগান না দেওয়া যায়। ভালো খাবার তো দূরের কথা। উচ্চমানের খাবার না দিতে পারার একটা চাপা দুঃখ তো মায়ের মনে থাকেই। ছুটির দিন, দুপুরে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল প্রতিধ্বনি। ঘুমোলে মানুষের মুখে নিষ্পাপ ছবি ফুটে ওঠে যার মনের ধাত যেমনই হোক না কেন। সেই সময়ে বুঝি মানুষের সত্ত্বা, স্রষ্টা বা অন্তর্যামী পুরুষের সাহচর্যে থাকে। প্রনতা একদৃষ্টে চেয়ে রইল স্বামীর মুখের দিকে। মানুষ যখন জেগে থাকে তখন তার মুখের দিকে তাকাতে গেলে চোখের দিকেও তাকাতে হয়। কিন্তু এক-একজনের চোখের দৃষ্টির প্রখরতা বা শক্তি এক-একরকম শক্তিশালী, তাই যে কেউ যে কোনও চোখে তাকিয়ে থাকতে পারে না তেমন। এই দৃষ্টির প্রখরতাই ব্যক্তিত্ব বা গাম্ভীর্যের পরিচায়ক। ঘুমন্ত মানুষের চোখের দিকে তাকাতে সে সমস্যা নেই। প্রনতার মনটা তো আর ইঁট কাঠ পাথরের বা কাঁকর মেশা মাটির তৈরি নয়। তার মনেও যেমন দুঃখ আছে বিতৃষ্ণা আছে তেমনি আছে প্রেম দয়া মায়া করুণা সহানুভূতি ইত্যাদি। সে ভাবতে থাকে, সত্যিই তার স্বামীর মধ্যে যে গুনটা আছে তা তো অনেকের মধ্যেই নেই। কত মেয়ের স্বামী তো মদ খায়, বউ পেটায়, পার্টি করে, ক্লাব করে, মানে সময় পেলেই ক্লাবে গিয়ে তাস পেটায় ক্যারাম খেলে। তার স্বামীর মধ্যে সত্যি কথা বলতে কি এসব কিছুই নেই। সেদিক থেকে সে কিন্তু ভাগ্যবতী। সে ভালো জিনিস হাতে পেয়ে তার অমর্যাদা, অবমূল্যায়ন ক'রে ফেলছে না তো! তার মনটাও ভারি হয়ে আসে। আরও ভাবতে থাকে, নিজেকে অক্ষমতার দোষারোপ ক'রে, কিছু কিছু উগ্র আচরণ বোধহয় দারিদ্রের কারণেই হাজির হয় জীবনে। আদতে মানুষটা হয়ত তেমন নয় যেমনটি তাকে দেখা যায় দারিদ্রজনিত সংসারিক অসম পরিস্থিতির কারণে। মায়া হয় তার স্বামীর জন্য। দুঃখ হয়। রাগ হয় নিজের প্রতি অভাবের তাড়নায় রাগ সামলাতে না পারার কারণে। ওদিকে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকলো প্রতিধ্বনি। ফেসবুক পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি কিছু নেট-পত্রিকাতেও লেখে সে। এইরকমই একটি পত্রিকা থেকে তার কাছে ফোন এলো, সে নাকি এই বছরে দুটি বর্ষসেরা পুরস্কার একাই পেয়েছে। একটি "পোয়েট অফ দ্যা ইয়ার" অন্যটি "লিটারেট অফ দ্যা ইয়ার"। দুটিরই আর্থিক মূল্য এক লাখ টাকা ক'রে সর্বমোট দুই লাখ টাকা। প্রথমে হতবাক পরে বিহ্বল শেষে আশ্চর্য্য হয়ে গেলো। আনন্দে কি করবে ভেবে পেল না। পাশাপাশি ভাবলো, বিপদে উচ্ছ্বাসে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। নইলে সিদ্ধান্ত গুলো এলোমেলো হতে থাকে। ধির স্থির শান্ত চিত্তে ভাবতে থাকলো, সঠিক সিদ্ধান্ত অন্বেষণের এটাই সঠিক সময়। আঁধারের মধ্যে এটাই একচিলতে জীবন-সূর্য্য, ভাগ্য-সূর্যের আলো। সে প্রথমে ভাবলো, ঘরের পাশে আর একটা ঘর ক'রে নেবে এখনকার বারান্দা এবং ঘরের মাপ সমেত বেশ বড় ক'রে। তাহলে সেটাতে পার্টিশন দিয়ে একটা মাঝারি এবং একটা ছোট হলেও কামরা হয়ে যাবে। আপাতত তার লেখালিখির সাথে শোয়ার ঘরও হবে। তারপর ছেলে মেয়েরা বড় হ'লে তখন ঘরের সমস্যা আর থাকবে না। এসবেষ্টসের বাড়ি যখন তার এবং ঘরের পাশে ঘর হলে মাত্র ছোটো ছোটো পাঁচটা দেওয়াল গাঁথলেই বাড়তি দু'টি ঘর হয়ে যাবে। যদি পঞ্চাশ হাজার টাকায় কাজটা সমাধা হয় তাহলে বাকি দেড় লাখ টাকা ব্যাঙ্কে ফিক্স ডিপোজিট রাখলে মাসে মাসে কিছু সুদও পাওয়া যাবে। যা দিয়ে তার অনেক সুরাহা হবে সংসার ও সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে। সংসারে একটু সুরাহা হলে মনে একটু শান্তিও আসবে। একাগ্র মনে লেখালিখি করার পক্ষে যা অতীব স্বস্তিদায়ক। চিন্তার পিঠে চিন্তা আসতে থাকে। তার মধ্যে ভালো মন্দ সবই। বিচক্ষণতার সাথে শুধু বেছে নিতে হয়। এও ঠিক, বেশি বাছতে গেলে লোম বাছতে আর কম্বল থাকে না। তখন অনেকক্ষেত্রে ভালোর জায়গায় মন্দটাই এসে যেতে পারে। তাই অন্য চিন্তার অন্বেষণ সে আর করলো না। তবে পূর্বের চিন্তা অনুসারী একটা চিন্তা তার মনে আবির্ভাব হলো, ব্যাঙ্কের থেকে পোস্ট অফিসে দুই শতাংশ সুদ বেশি পাওয়া যায়। তফাৎ এই, ব্যাঙ্কে এক বছরের জন্য টাকা রাখলে সর্বোচ্চ সুদ মেলে এবং পোষ্ট আফিসে পাঁচ বছরের জন্য রাখতে হয়। মন্দ নয়। টাকা হাতে থাকলে খরচের প্রবণতা আসে। একটু আফসোস হয় তার। বাবার মুখে শোনা, আগেকার দিনে পোস্ট আফিস এবং ব্যাঙ্কে সুদের হার সর্বোচ্চ তেরো শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। সে প্রায় বত্রিশ চৌত্রিশ বছর আগের কথা। সেই সুদ পোষ্ট অফিসে এখন মাত্র আট শতাংশ। এবং ব্যাঙ্কে মাত্র ছয় শতাংশ। এটা ফিক্সট ডিপোজিটের হিসেব। সেভিংসে সেটা মাত্র তিন সাড়ে তিন শতাংশ। টাকার দাম যে কিভাবে কমে সেই হিসেব সে না জানলেও এটা বোঝে, টাকার দাম কমে, সাথে সাথে কমে মানুষের শ্রমের দাম, স্বভাবতই কমে মানুষের দাম। কেননা, টাকার মূল্যহ্রাসের সাথে সাথে বাড়ে জিনিসের দাম। ঘুম ভেঙে গেল প্রতিধ্বনির হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে। ঘুম ভেঙে ভাবতে থাকলো, জীবনে কে যে কখন আসে কে যে কখন যায় কে জানে! সে, মানুষ হোক বা সুযোগ হোক কিম্বা শুভ অশুভ সময় কত কিছু যে হতে পারে তা কে বলতে পারে! কিন্তু নিমেষেই স্বপ্নসুখের কথা এবং স্বপ্ন ভাঙার পর স্বপ্ন যে স্বপ্নই, বাস্তব নয় এই চিন্তায় হতাশা এলো তার মনে। ভাবলো এত সহজে কি আর ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে! দুর্ভাগ্যের শিকড় বুঝি একটু লম্বাই হয় সৌভাগ্যের শিকড়ের থেকে। মনে ধেয়ে আসা দুঃখ তাকে দিয়ে একটা ছোট্ট কবিতা সাজিয়ে নিলো, "পাথরে অঙ্কুরিত হয় না বীজ, মহীরুহ হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জল আলো বাতাসের সাথে চাই উর্বর মাটি, নিরাপত্তা আর সার, দুর্মূল্য খনিজ।" * * * * *

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment