Avatar

কাব্য কবি দর্শন বোধ

দেবপ্রসাদ বসু (উপাসক)

কাব্য কবি দর্শন বোধ ---------------*------------- দেবপ্রসাদ বসু ১৫/০৩/২০২০ কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন,--- সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। মনে রাখতে হবে কবিত্ব একটি অবস্থা, চেতনার বিশেষ একটি জাত গোত্র শ্রেণী। "কেমন আছো, ভালো আছি, তোমার নুপুরের কাছাকাছি যাওয়া হয়নি অনেকদিন, হয়তো সময় দেয়নি সময়, সুযোগ; অন্তরের এ দুর্যোগ আর চলবে কতদিন!" এটাও হয়তো একটা কবিতা বা না-কবিতা। যা-ই হোক না কেন, যা যখন মনে এলো তাই লিখে প্রকাশ করলেই সেটা কবিতা তা মনে হয় না। কবিতার একটা নিজস্ব ভাষা আছে বুঝি! তাকে রপ্ত করতে হবে বিভিন্ন কলমের বিভিন্ন লেখার অভিজ্ঞতার সাথে জ্ঞান-পিপাসা, কৌতূহল নিরসনের প্রচেষ্টা মিশিয়ে বা উত্তর খুঁজে। বুঝতে হবে বিভিন্ন অভিব্যক্তি, পৌঁছতে হবে তার আত্মায়, হৃদয়ে, নিজস্ব বোধের উচ্চতায় পৌঁছে। আমাকে কেউ কবি বললেই আমি কতখানি কবি আমাকেই আবিষ্কার করতে হবে নিরপেক্ষ সৎ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সন্তান টেরা হোক, দাঁত উঁচু হোক, আর যাই হোক না কেন এটা মায়ের দুঃখ, আপসোস, চিরকালীন যন্ত্রণা। তবে সেটা গোপন। কিন্তু অন্য কেউ যদি তা তার সম্মুখে বলে তখন তার কষ্ট তো হবেই। এটা হচ্ছে মায়া। এই মায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের কাছে নিজেই কঠোর হতে হবে। যে আত্মদর্শনের দ্বারা কবিতা বা সাহিত্য রচিত হয় সেই আত্মদর্শনের সাহায্যেই নিজের সামনে নিজেকে দাঁড়া করাতে হবে। আর যাকেই ফাঁকি দেওয়া যাক না কেন নিজেকে ফাঁকি দেওয়া যাবে না। সমক্ষে প্রকাশ না করলেও নিজের কাছে ধরা পড়ে যেতে হবে। সেটাই হলো আত্মগ্লানি। সে-ধরা পড়ে যাওয়াতে যদি কারও অনুশোচনা না হয় তবে বুঝতে হবে তার দ্বারা যা হচ্ছে তা আর যাই হোক যথার্থ কবিতা বা সাহিত্য নয় কারণ সেই উচ্চতায় পৌঁছবার বোধই তো তার নেই। সেটা হলো গিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে নইলে বিশেষ বলবার মতো কিছু সৃষ্টি হবে না। কালজয়ী লেখা তো দূরের কথা। হয়তো পরিচয়ের ঘনত্বে কিম্বা তোষামোদে অনুদানের বিনিময়ে কোথাও কোথাও কিছু লেখা ছাপা হবে এবং নিজেকে এড়িয়ে নিজেকে সাময়িক তুষ্ট করা যাবে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। কিন্তু তারও আগে আর একটি কথা, মানুষটিকে সৎ, দৃঢ়চিত্ত, ন্যায় নীতি পরায়ণ সামাজিক দায়বদ্ধ সমাজ সচেতন হতে হবে। কোনও রঙে লিখে সার্বজনীন পথ তৈরি হবে না। তার জন্য না লেখা যাবে প্রভাবিত লেখা, না লেখা যাবে মেকি প্রতিবাদী লেখা। না করা যাবে নিজ মত পথ এবং যে বিষয়ে নিজস্ব বিশ্বাস সেই অনুযায়ী বেছে বেছে প্রতিবাদ। চিন্তার সর্বজনীনতা সর্বাগ্রে চাই। কেননা কবি হচ্ছেন কালের কবি, আনতাবড়ি কলম চালিয়ে সাময়িক কবি নন। আগে জানা, তারপর বিশ্বাস, শেষে নিজের জীবনে তার প্রতিফলন এবং সর্বোপরি তা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এটাই সততা। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ বিশ্বাসযোগ্যতা। এই বিশ্বাস এলে কারও কথায় হেলা চলবে না। তবে একটা কথা, নিজেস্ব বিশ্বাসের একটা মজবুত ভিত্তি থাকতে হবে। সেটা বোঝা যাবে মনের সাথে, অনুভূতির সাথে, উপলব্ধির সাথে একান্তে নির্লোভ কথা বলতে পারলে। আর একটা কথা, যা মনে এলো তা লিখলে তো হবে না। আগেও বলেছি। আবারও বলছি, কবিতার একটা শরীর আছে, তার আছে কিছু নিজস্ব চরিত্র। কবিতা আমাদের ব'লে দেয়নি যে সে কে। আমরা তাকে আবিষ্কার করেছি। এই আমরা অর্থাৎ বোদ্ধাসমাজ। অন্য অর্থে আমরা কালে কালে যুগে যুগে তার অনুসরণকারি পরম্পরা। আমরা যেমন বলি, সময়ের তালে তাল রেখে ধর্ম সমাজ রাজনীতি সবেরই সংস্কার প্রয়োজন ঠিক তেমনি কবিতাকেও এমনকি গদ্যরীতিতেও আমরা পরিবর্তন ঘটিয়েছি বা ঘটাচ্ছি। এই পরিবর্তনশীলতা অমোঘ। কেননা আমাদের নিত্য নৈমিত্তিক চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন হচ্ছে আমাদের নিত্য নতুন দেখায়, নিত্য নতুন অভিজ্ঞতায়। এই পরিবর্তন, সংশোধন বা পরিমার্জনকে আধুনিক ভাষায় বলে,--- পোষ্ট-মর্ডানিজম। এটাকেই বলে বিবর্তন। এই বিবর্তন যেমন নিরন্তর ঘটে চলেছে আমাদের শরীরে ঠিক তেমনি আমাদের মনে, চিন্তা চেতনায়। মনে রাখতে হবে পরিবর্তনের নিম্নগামীতা বিবর্তন নয়, সেটা হলো অবক্ষয়। পাহাড় নিচু হয় কখন? নিশ্চয় ধসে, ভূমিকম্পে। আমাদের ভিতরের মোহের নাগপাশে আমরা বন্দিদশা যাপন করি তখনই এই অবক্ষয়ের শুরু। নিঃশব্দে ঘুন উঁই যখন কাঠ খেয়ে ফেলে তখন আমরা বুঝতে পারিনা ওই শব্দ না হওয়ার জন্য। ঠিক তেমনি আমাদের ভিতরকার চেতনার ক্ষয় শব্দ না হয়েই হয় বা সে সামান্য শব্দ শোনাই যায় না মহানন্দের অট্টহাসিতে। আজকালকার কবি নাম্নীরা ফেসবুক পত্রিকার দৌলতে এত ভুরি ভুরি পুরস্কার পাচ্ছে যার ফলে অযাচিত উচ্ছ্বাসে নিজেদের মাপতে ভুলে যাচ্ছে বা মাপতে অক্ষম হচ্ছে। তার জন্যই চারিদিকে এত আত্মপ্রচারের ঘনঘটা। নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় করে দেখাবার আহামরি প্রচেষ্টা। স্বনামধন্য কবি সাহিত্যিকদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে তার পোষ্ট, তার বিজ্ঞাপন এই অনুমানে বা দৃষ্টিকোণ থেকে যে, দেখো আমি কত বড় মাপের একজন কবি সাহিত্যিক। সেই সব পত্রিকা থেকে কিছু গড়ে-পদবি পেয়ে তা নিজেই নিজের নামের আগে বসিয়ে ব্যবহার করছে। পৃথিবীতে নাম, পদবি এমনই একটি জিনিস বা অনুভব যা নিজে ব্যবহার করে না, তা করে অন্যে। পাশাপাশি একথাও ঠিক, কবিতা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। তা সর্ব অর্থেই স্বতঃস্ফূর্ত। কবিতা নদীর স্রোতের মতো। তাতে কোনও শর্তের বাঁধ দিলে হবে না। অর্থাৎ তা করলে প্রাকৃতিক বোধের স্পর্শ পাওয়া যাবে না, পরিবর্তে এসে যাবে কৃত্রিমতা। কবিতায় আমাদের অগ্রগামীদের আবিষ্কৃত কিছু কিছু নির্দিষ্ট ছন্দ আছে ঠিকই। তার বাইরে বেরিয়ে নতুন কিছু ছন্দ আবিষ্কার করাও যায় বা সম্ভব। এগুলো অন্তরের একান্ত নিজস্ব গভীর বোধের ব্যাপার। উৎকৃষ্ট বিকল্প বা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য কিছু ক'রে দেখানোটাই কৃতিত্বের বা মুন্সিয়ানার। সবশেষ কথা, যোগ্যতা এড়িয়ে প্রতিযোগিতা নয়, স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহের অনুসরণ। প্রকৃতিতে যেভাবে বৃষ্টি বাতাস ঝড় আসে, আগ্নেয় উদগীরণ হয়, চাঁদ উঠে আকাশে জ্যোৎস্না ছড়ায়, ঝর্ণা ঝরে, রামধনু ওঠে ঠিক সেভাবেই বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি, প্রকৃতি, সমাজ, সম্পর্ক থেকে দেখা, শোনা ও বিচার বিশ্লেষণ করা বিষয় মন মস্তিষ্কের সংযোগে বা কৃতকর্মতায় হৃদয় থেকে উৎসারিত ভাব ভাবনাকে সংগ্রহ ক'রে উপস্থাপিত করতে হবে। সেটা ঠিকঠাক করতে পারলেই ব্যাস। এককথায় কবি হলেন সামাজিক-বেদ, সত্যদ্রষ্টা ঋষির মতন। সেই সূত্র অনুসারে,--- কোনও সত্ত্বার পক্ষে আত্মিক স্পর্শ ব্যতীত বড় মাপের কবি হওয়া তো দূরের কথা, কোনও কবি হওয়াই সম্ভব নয়। সে-কবিতায় সমৃদ্ধ, সংশোধিত হবে সমাজ, তা হবে সমাজ-চেতনায় মন্ত্রের মতো। সত্ত্বার স্বাস্থ্যকর বোধ, পরিণত হবে দর্শনে। অনুসরণীয় হয়ে উঠবেন তিনি। * * * * *

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment