Avatar

শুকনো পণ্ডিত ভিজে পণ্ডিত

দেবপ্রসাদ বসু (উপাসক)

শুকনো পণ্ডিত ভিজে পণ্ডিত -------------------*------------------- দেবপ্রসাদ বসু ২৯/০১/২০২০ দুই রকমের পণ্ডিত আছে, শুকনো পণ্ডিত আর ভিজে পণ্ডিত। শুকনো পণ্ডিত নিজের জানার বাইরে আর যে জানা আছে তা মানতেই চায় না। সে ভাবে সেই-ই সব ও একমাত্র জানে যাকে বলে সবজান্তা। তা থেকে জন্ম নেয় হীনমন্যতা। অর্থাৎ, অজ্ঞানতায় পুরুষ্ট একমদ্বিতীয়ম। কুয়োর ব্যাঙ যেমন সাগরের ব্যাঙকে পাত্তাই দিতে চায় না নিজের জানার পরিধির মাপের সাথে সাগরের ব্যাঙ-এর জানার পরিধিকে মেপে, নিজের না জানা অক্ষমতা দিয়ে নিজেকে মাপার আত্মম্ভরিতায় মেকি আনন্দে ভর ক'রে। শুকনো পণ্ডিত বলেন, শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে, এবং ভিজে পণ্ডিত বলেন, নিরস তরুবর পুরশ ভাগে। ভিজে পণ্ডিত অন্যকে প্রশ্ন করেন জানার আগ্রহে ও কৌতুহলে, চেতন সমৃদ্ধির আশায়। আর শুষ্ক পণ্ডিত অন্যকে প্রশ্ন করেন নিজেকে জহির করার অভিপ্রায়ে অন্যে জানে কিনা ও কতটুকু তার পরীক্ষা নিতে অযথা বাগাড়ম্বরে। কথায় বলে, আলোচনায় জ্ঞান বাড়ে। একথা শুনে শুকনো পণ্ডিত বলেন, অবশ্যই . . . অবশ্যই। এই জন্যে মাঝে মাঝেই আলোচনা সভার আয়োজন করা উচিত নিজদের চেতনার সমৃদ্ধির স্বার্থে। ভিজে পণ্ডিত বলেন, আরে বাপু! অসম আলোচনায় আবার জ্ঞান কমতেও পারে বা বিধ্বস্ত ও বিভ্রান্তও হতে পারে। আলোচনা প্রায় সমানে সমানে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। নচেৎ আলোচনা নিছক সময় ও মেধা ক্ষয়কারি তর্কে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। একটা হাল্কা উদাহরন হিসেবেই ধরা যাক যে, একটা ক্লাস ফাইভের ছাত্রের সাথে বি.এ. - এম. এ. পাশ ছেড়েই দিলাম, একটা মাধ্যমিক বা হায়ার সেকেন্ডারি পাশ ছাত্রের সাথে আলোচনা মোটেই জ্ঞান বৃদ্ধির আলোচনা হয়ে উঠবে না যদি কিনা ক্লাস ফাইভের ছাত্রটি বিনয়ের সাথে জ্ঞান প্রার্থনা করে। উল্টে নিজেই যদি নিজেকে বি.এ. এম.এ. পাসের পর্যায়ে উপস্থাপিত করতে সচেষ্ট হয় নিজস্ব আত্মম্ভরিতার পাল্লায় প'ড়ে তাহলে যা হবার তাই হয়, ওই আলোচনা তর্কে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখে। নিজের মাপ ভুলে যাওয়াই নিজের সর্বনাশের কারণ ও একই সাথে সামাজিক সুস্থ পরিবেশের পক্ষেও ক্ষতিকর। শুকনো পণ্ডিতের মধ্যে একটা দাদাগিরি ভাব বা হামবড়া ভাব সদা জাগ্রত থাকে এবং ভিজে পণ্ডিতের মধ্যে থাকে বিনয়, আরও জানবার আগ্রহ, নিজেকে পরিণত করবার সদিচ্ছা। ওই যে, শুকনো পণ্ডিত বৃক্ষের ফলহীন শাখার মতো সর্বদা মাথা উঁচু করে থাকে এবং ভিজে পণ্ডিত ওই ফলভারে নত শাখার মতো বিনয় সম্বল করেই বাঁচে। কথায় বলে না! বিদ্যা দদাতি বিনয়ম। এটা ভিজে পণ্ডিতের কথা। আর শুকনো পণ্ডিতের জন্য প্রযোজ্য অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। অর্থাৎ, খণ্ডিত জ্ঞানের আস্ফালন পূর্ণ জ্ঞান অর্জনের কল্পনায়। শুকনো পণ্ডিত আগেকার দিনে পুঁথি মুখস্ত ক'রে বা আজকের দিনে গুগল ঘেঁটে এবং কিছু কুইজ বই পড়ে কিছু বিষয় লিখে রেখে বা মুখস্ত ক'রে নিজেকে সবজান্তা ভেবে এখানে সেখানে পাণ্ডিত্য ফলিয়ে কম জানা মানুষের কাছে সম্মান আদায় করতে চায় এবং সক্ষমও হয়। এইভাবে ভুয়ো কিছু টুকরো টুকরো স্তাবকতা ও তোষামোদকে সম্মান ভেবে আরও উৎসাহিত হয়ে একটা স্তাবক ও তোষামোদি গোষ্ঠী বানিয়ে তাদের দ্বারা একটা চাষারে বা আকাট সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি সমাহারের অন্ধ অজ্ঞ সমর্থনে নিজেকে বাদাবনে শেয়াল রাজা ভেবে আত্মআহ্লাদ উপভোগ করতে থাকে। এটাকে আত্মছলনাই বলে। অপরদিকে ভিজে পণ্ডিত কিছুই জানলাম না ভেবে জীবন সায়ান্নে আক্ষেপে বলতে থাকেন, "সারাজীবন জ্ঞান সমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়ালাম মাত্র!" আসলে প্রকৃত জ্ঞান পুঁথিতে নয়, প্রকৃত জ্ঞান মনে। বাইরে জ্ঞানের উপকরণ মাত্র। এই বাইরের প্রকৃতির সাথে ভিতরের প্রকৃতির মিলন ঘটাতে হবে সাধ্য সাধনা নিত্য নতুন চিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমে অর্থাৎ, নিরন্তর চিন্তাচর্চার চেষ্টায়। এই পথে ধাপে ধাপে জ্ঞান যখন বৃদ্ধি পেতে থাকবে তখন নিজেরই নিজের অতীত জানাকে অনুশীলন অর্জিত বর্তমান জানার কাছে ছোট ও অপাংক্তে়য় মনে হবে। জ্ঞান বাড়লেই তার সত্য উপলব্ধি হবে। সে তখন প্রকৃত আত্ম হিতকরী চিন্তার বা শুভ বুদ্ধির হদিস পাবে। সে তখন প্রাকৃতিক নিয়মেই সৎ হবে। সত্য স্বীকারে উৎসাহিত হবে। হয়ে উঠবে সত্যদ্রষ্টা ঋষির মতন একজন দার্শনিক। এই দর্শন চর্ম চোখের নয়, এই দর্শন মনের অর্থাৎ মনস্তাত্বিক বিষয়, অনুভব ও উপলব্ধি অদৃশ্য এই দুই চোখের কাজ। পুঁথির জ্ঞান এই পথেই খণ্ডিত জ্ঞান, অসম্পূর্ণ জ্ঞান। কারণ তা উক্ত প্রকারই খণ্ডিত দর্শনের ফলশ্রুতি। খণ্ডিত জ্ঞান কিছু খানা ডোবা পুষ্করিনির খোঁজ দিতে পারে মাত্র। জ্ঞান সমুদ্রের খোঁজ দিতে অক্ষম। তাই কথায় বলে, জানার কোনো শেষ নেই, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই মনীষী বলেন, ভাবো, ভাবো, ভাবা প্রাকটিস করো। আমি বলি, নিরন্তর চিন্তা চর্চা করও। একটি চিন্তার সামনে অন্য একটি চিন্তাকে দাঁড় করিয়ে দাও। মুখোমুখি দেখা হোক তাদের। ভাবনার সাথে ভাবনা বিনিময় হোক। তা থেকে বেরিয়ে আসুক প্রকৃত উৎকৃষ্ট চিন্তা। তাই তো ভিজে পণ্ডিত বলেন, জলাশয়ে জল ভরতে গেলে প্রথমে কলসিতে ঢক ঢক ক'রে শব্দ হয়। কিন্তু কলসি পূর্ণ মাত্রায় ভ'রে গেল আর শব্দ হয় না। কথা হলো, নিরন্তর চিন্তা চর্চা করতে করতে ভিতরটা ক্রমাগত পুরুষ্ট হতে থাকে। তখন রসালো হয় হৃদয়, মন, মস্তিষ্ক। নইলে যা হয় তার নাম নিরেট অবস্থা। এই নিরেট অবস্থাই হ'লো, জীবনের বোঝা, সত্য দর্শনের অন্তরায়, মূর্খতার উৎসাহ দাতা। অহঙ্কারের আগুনে পোড়া নিরেট শুষ্ক মন। ঠিক কাঁচা মাটির পার্থিব আগুনে পোড়া মাটির মতন। যা দিয়ে দ্বিতীয় আর কোনও কাজ হয় না। শুকনো পণ্ডিত বলেন, মস্তিষ্কই সব, আর ভিজে পণ্ডিত বলেন, শুধু মস্তিষ্কই নয়, তার সাথে চাই হৃদয়। শুকনো পণ্ডিত শরীর সর্বস্ব এবং ভিজে পণ্ডিত শরীরের ভিতর প্রবৃত্তি-মন-স্বত্ত্বা ছাড়িয়ে আত্মা সর্বস্ব। তাই শুকনো পণ্ডিতের আস্ফালনই সম্পদ এবং ভিজে পণ্ডিতের সম্পদ বিনয়-সমীহ-ভ্রুক্ষেপ। সেই উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়ে ভিজে পণ্ডিত বলেন, আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলির পরে। কিম্বা, আরও প্রেমে, আরও প্রেমে মোর আমি ডুবে যাক নেমে। এই আমিই বা আমিত্বই হচ্ছে অহঙ্কারের জন্মদাতা। অহঙ্কারের অগ্নিতে শুদ্ধ জ্ঞানবীজ শুকিয়ে যায়। তা থেকে মুক্তির উপায় নতমস্তক। না, রক্ত মাংসের মস্তক নয়, এ মস্তক মনমস্তক। যেখান থেকেই উৎপত্তি উন্নসিকতার, অসহিষ্ণু মনের, মানবিক হৃদয়ের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। শুকনো পণ্ডিত বলেন, বুকের ছাতি চওড়া হওয়ার কথা। ভিজে পণ্ডিত বলেন, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়! শরীর খাঁচা, আত্মা পাখি। সেই পাখির শক্তিই ভিজে পণ্ডিতের সামর্থ ও জ্ঞান ভান্ডারের সমৃদ্ধির সূচক। এবার শেষ করি দুইজন ভিজে পণ্ডিতের উচ্চ মননশীল বাক্যালাপের মধ্য দিয়ে। কালজয়ী মহাকাব্য লিখতে ব'সে ঠিক হ'লো একজন অর্থাৎ রচয়িতা বলবেন এবং অন্যজন অর্থাৎ আর একজন পণ্ডিত তা লিপিবদ্ধ করবেন। এই পরিসরে একজন ভিজে পণ্ডিত বলছেন, তুমি বলতে বলতে থামলে আমি কিন্তু আর লিখবো না। লেখা বন্ধ ক'রে দেবো। তখন অন্যজন ভিজে পণ্ডিত বলছেন, ঠিক আছে, তুমিও প্রতিটি শ্লোকের মানে অর্থাৎ অর্থ বুঝে বুঝে তবে লিখবে। একজনের প্রতিটি শ্লোকের অর্থ বুঝে বুঝে লিখতে লিখতে অন্য জনের পরের শ্লোক তৈরি হতে যেতে থাকল মনের জ্ঞান ভান্ডারে। শুষ্ক পণ্ডিতের ক্ষেত্রে তা হয় না। কেননা, দু'জন শুষ্ক পণ্ডিতের নিজ মত প্রতিস্থাপনের বাক বিতন্ডায় মহাকাব্য রচনাটাই পন্ড হয়ে যেত। * * * * *

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment