Avatar

একটি রূপকথার গপ্পো

Sovan Bag

সেই যে সেই একজন ছিল না, যে সবকিছুর নাম দিত। সেই যে গো, যার ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু, মনে পড়েছে এবার? বেশ। তা যা বলছিলুম, শোন। তা সেই লোকটারও একটা নাম ছিল। খুব সাধারণ নাম। এত সাধারণ, এত সাধারণ যে সবাই সে নামটা একদিন ভুলেই গেল। লোকে তখন তাকে ডাকতে লাগল রাজামশাই বলে। "রাজামশাই সুপ্রভাত।" "রাজামশাই ভালো আছেন?" "রাজামশাই খেয়ে নিন।" "রাজামশাই শয্যা প্রস্তুত।" এমনি করে ডাকতে ডাকতে হল কী, সবাই এটাও ভুলেই গেল যে রাজামশাই একটা নাম। এমনকি ওই লোকটাও ভুলে গেল। তখন লোকেরা তাকে সেলাম করতে লাগল। উপঢৌকন দিতে লাগল। বিচার চাইতে লাগল। আবার কয়েকজন জিজ্ঞেস করতে লাগল - "রাজামশাই, আপনার উজির কোই?" "আচ্ছা বেশ। তোমার নাম আজ থেকে উজির।" "রাজামশাই, আপনার কোতোয়াল কোই?" "আচ্ছা বেশ। তোমার নাম আজ থেকে কোতোয়াল।" "রাজামশাই, আপনার সভাকবি কোই?" "আচ্ছা বেশ। তোমার নাম আজ থেকে সভাকবি।" এমনি করতে, করতে একসময় সেই লোকটার সৈন্য হল, সামন্ত হল। হাতিশাল হল, ঘোড়াশাল হল। সিংহাসন হল। প্রজা হল। তারপর একদিন সেনাপতি এসে বলল, তার একটা যুদ্ধ চাই। সভাকবি এসে বলল, তাকে বীরগাথা লিখতে হবে, কাহিনী চাই। রাজামশাই উজিরকে ডেকে বললেন, "উজির শত্রু চাই, শত্রু আনো।" "জাঁহাপনা, শত্রু কোথা থেকে পাই?" "কেন? দেশে কি দৈত্যিদানো কম পড়িয়াছে?" 'পড়িয়াছে' শুনেই উজির বুঝে গেলেন রাজামশাই রেগে গেছেন। তিনি রাজামশাইয়ের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, "স্যার, আপনার আগেও একজন রাজামশাই ছিল। সহজ সহজ দৈত্যিদানোদের সে ব্যাটাই সাবাড় করে দিয়ে গেছে। এখন শুধু শক্ত শক্তগুলোই পড়ে আছে। তাদের নামগুলোও খুব ভয়ংকর। যেমন -" "থাক, থাক। নাম শুনে কাজ নেই। বরং সহজ শত্রু কোথা পাই বল।" উজির দাড়ি চুলকায়, শত্রু পায় না। রাজা মাথা চুলকায়, শত্রু পায় না। এদিকে হয়েছে কী, সেই রাজ্যে এক জাদুকর ছিল। তার নাম মিচকে। সে এসে রাজামশাইকে বলল, "সহজ শত্রু দিতে পারি, তবে পুরস্কার চাই।" "পাবে, যদি কাজ হয়।" তখন মিচকে ফিসফিস করে বললে, "মহারাজ, আমি অন্ধকার দিয়ে ভুসভুসে দৈত্যিদানো তৈরি করে দেব। আপনি তলোয়ার চালালেই কেটে দু খন্ড হয়ে যাবে।" "ও বাবা! তাহলে তো অনেক অন্ধকার লাগবে। এত অন্ধকার পাবে কোথায়?" মিচকে মিচকি হেসে বললে, "কাটার কিছু পরেই ওরা নিজে নিজে আবার জুড়েও যাবে মহারাজ। তাই বেশি অন্ধকার লাগবে না। যেটুকু লাগবে তা প্রজাদের থেকেই পেয়ে যাব।" তারপর রাজামশাই মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, "মন্ত্রী সেনাপতিকে খবর দাও। যুদ্ধ।" মন্ত্রীমশাই সেনাপতিকে তলব করে বললেন, "সৈন্য সাজাও। যুদ্ধ।" সেনাপতিমশাই সৈন্যদের বললেন, "চল, যুদ্ধ।" সবাই রেডি। তখন মিচকে এসে রাজামশাইকে বললে, "জাঁহাপনা, জনতাও জানুক যুদ্ধ হচ্ছে। নইলে যে যুদ্ধ করাই বৃথা।" রাজামশাই তখন বললেন, "বুলাও জনতা। হম ভাষণ দেগা।" তা এল প্রজারা। এসে তারা বলল, "মহারাজ বড় অভাব।" রাজামশাই বললেন, "কোই অভাব! সব ষড়যন্ত্র। এখন যুদ্ধ হবে, যুদ্ধ।" প্রজা: "মহারাজ বৃষ্টি নেই। চাষ নেই।" রাজা: "সব ওই টম দৈত্যির কান্ভ। চল যুদ্ধ করি, যুদ্ধ।" প্রজা: "মহারাজ পেটে খিদে। বড় কষ্ট।" রাজা: "এখন আগে দেশ, পরে তোমাদের কথা শুনব। সবাই মিলে যুদ্ধ করে দৈত্যদের হারিয়ে দিই চল। যুদ্ধের সময় একটু কষ্ট তো করতেই হয় সোনা। তোমাদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। সবাই মিলে বল, জয় দেশ।" প্রজারা সমস্বরে চিৎকার করে বলল, "জয়, মহারাজের জয়!" রাজামশাই তো মহাখুশি হয়ে যুদ্ধে গেলেন। হাওয়ায় তলোয়ার চালিয়ে ঘ্যাচাং করে দৈত্যি কাটেন, তারা আবার জুড়ে যায়। কাটা আর জোড়া। কাটা আর জোড়া। কাটা আর জোড়া। বেশ চলতে লাগল। সভাকবিও খুব খুশি। মহা সুখে রাজকুমারী লেখেন, সোনার কাঠি লেখেন, রূপোর কাঠি লেখেন, তেপান্তরের মাঠ লেখেন, দৈত্যপুরী লেখেন, যুদ্ধ লেখেন, উদ্ধার লেখেন, বীরত্ব লেখেন। একটা ছোট্ট রাজকুমারও লিখলেন। তারপর একদিন বললেন, "মহারাজ, আপনার নাম ভগবান রাখি?" রাজামশাই মিচকেকে বললেন, "সময় হয়েছে। বর চাও।" "মহারাজ, আমার মিচকে নামের বদলে নতুন নাম দিন। আমার নাম হোক বাবুরাম।" "তথাস্তু" এভাবে অনেক যুদ্ধু হল। অনেক বীরগাথা রচিত হল। প্রজারা অনেক রাক্ষস মরার কথা, দৈত্যি মরার কথা জানতে পারল। অনেক দিন কেটে গেল। সেই রাজামশাই এখন বুড়ো হয়েছেন। এমন সময় একদিন দেখা গেল দুটো লোক ফিসফিস করে কথা বলছে। "রাজা হবে?" "রাজা তো আছে।" "রাজা তো থাকবেই। তুমি রাজা হতে চাও কিনা বল।" "চাই, চাই, চাই।" "বেশ। আমি গোটা রাজ্যে বড় বড় সাপ ছেড়ে দিচ্ছি। তুমি সবাইকে বলতে থাকো, এই রাজা বুড়ো রাজা। যুদ্ধ পারে না। খালি ঝিমোয়। প্রজাদের কথা ভাবে না। আমি রাজা হলে যুদ্ধ করে সব সাপদের মেরে ফেলব।" "ওরে বাবা! ও আমি পারব নি কো। সাপে আমার বেজায় ভয়। টাটা, বাই বাই।" "আরে, আরে, আরে! পুরো কথাটা না শুনেই পালায়! ওই যে গো, যে সাপের শিং নেই, নোখ নেই, চোখ নেই। ফোঁসফাঁস করে না। ঢুসঢাস মারে না। কাউকে কাটে না, সেই সব সাপ দেব তো। তুমি তো দেখছি কিছুই পড়নি!" "এমন সাপেদের লোকে ভয় পাবে কেন?" "হাঃ, হাঃ, হাঃ। লোকে সাপ শুনলেই ভয় পায়। পরীক্ষা করে দেখেও না সাপটা সত্যিই বিষধর কী না।" "ও, তাহলে তো ঠিক আছে। কিন্তু এত সাপ পাবে কোথায়?" "কেন! প্রজাদের কাছ থেকে। ওদের মনের মধ্যে কত যে... থাক সেকথা। তুমি শুধু বলতে থাকো, যুদ্ধ। বলতে থাকো, বুড়ো রাজা এদের সাথে পারে না। দুয়ো, দুয়ো। তারপর একদিন সুযোগ বুঝে রাজার পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিলেই, ব্যস। তুমি রাজা।" "ভারি বুদ্ধি তো তোমার! তোমার নাম কী দোস্ত?" "বাবুরাম।" তারপর একদিন সত্যি সত্যি রাজার পেটে তলোয়ার ঢুকে গেল। সিংহাসন থেকে পড়ে যেতে যেতে রাজামশাইয়ের মনে পড়ে গেল, আসলে তো সে সেই লোকটা যে সবকিছুর নাম দিত। মরে যাওয়ার আগে সে শেষবারের মতো নতুন রাজার নাম দিয়ে গেল - "প্রতিবিম্ব"

Click Here Clap

No. of Clap : 0

Total Comments:0

Please Login to give comment